এ সম্পর্কিত আরও খবর
মৃত নবজাতকের সঙ্গে কারাবন্দি বাবার প্রথম এবং শেষ সাক্ষাত
- লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:
- প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ১০:০৯ এএম
-
ছবি: নিউজ এক্সপ্রেস
একটি হত্যা মামলায় কারাবন্দি রয়েছেন ফারুক হোসেন নামে এক যুবক। আর তার সঙ্গেই ঘটে গেলো এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। কারা ফটকেই স্বাক্ষাত হয়েছে তার নবজাতক সন্তানের সঙ্গে৷ তবে শিশুটির হাসি কান্না কিছুই তিনি দেখতে পাননি। কারণ শিশুটি ছিল মৃত। আর এটিই ছিল মৃত সন্তানের সঙ্গে তার প্রথম এবং শেষ সাক্ষাত।
ঘটনাটি ঘটেছে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারে গত ১৪ মার্চ রাতে। কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেলের ভাষায়, 'বাবা (ফারুক) শুধু জিজ্ঞেস করলেন -স্যার, কথা বলে না যে? কষ্ট চাপা রেখে বললাম, কথা বলবে তুমি দোয়া কর, একদিন কথা বলবে। একটু আদর, এরপর বিদায়'।
জানা গেছে, ঘটনার ৫ দিন আগে ফারুকের সহধর্মিণী বৃষ্টি আক্তারের কোলজুড়ে শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখে। তবে শিশুটি অসুস্থ ছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। মানবিক দিক বিবেচনা করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে মৃত সন্তানের সঙ্গে কারাবন্দি বাবার শেষ সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন লক্ষ্মীপুর জেলা কারা কর্তৃপক্ষ। পরে জেলার সোহেল ফেসবুক পোস্টে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি উপস্থাপন করেন।
জেলারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গেলো বছর একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ফারুক নামে এক আসামি কারাবন্দি রয়েছে। ১৪ মার্চ রাতে তার স্ত্রী বৃষ্টি তাদের মৃত নবজাতক শিশুকে নিয়ে কারাগারের সামনে আসেন। শিশুটিকে একটিবার তার বাবার সঙ্গে দেখা করানোর জন্য আকুতি জানায় অসহায় মাসহ স্বজনরা। এরমধ্যেই মানবিকতা বিবেচনা করে ঘটনাটি চট্টগ্রাম বিভাগের ডিআইজি প্রিজন্সকে জানানো হয়। মানবিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় ডিআইজি বিশেষ অনুমতি প্রদান করেন।
এরপরের ঘটনা ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জেলার জানান, রাত তখন প্রায় ১২টা। নিস্তব্ধ চারপাশ। জেলা কারাগারের সামনে দাঁড়িয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স। এর ভিতরে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য মৃত নবজাতক সন্তানকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন তার মা ও স্বজনরা। শেষবারের মতো কারাবন্দি ফারুককে তার সন্তানের মুখ দেখানোর আকুতি নিয়ে কারাগারের ফটকে আসেন তারা। কিন্তু রাতে বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতের কোন নিয়ম নেই। এরপরও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে দেখা করার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। দেখা হয় মৃত নবজাতকের সঙ্গে তার বাবার। শিশুটিকে কোলে নিয়েও আদর করেছেন তিনি। এটিই ছিল মৃত সন্তানের সঙ্গে জীবিত বাবার প্রথম এবং শেষ দেখা। আর ঘটনাটি ছিল বাবা-ছেলের হৃদয়বিদারক মিলন।
লক্ষ্মীপুর কারাগারের জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ছিল। মানবিক দিক বিবেচনায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কারাবন্দিকে তার সন্তানের মুখ দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়। নিয়মের পাশাপাশি মানবিকতাও আমাদের দায়িত্বের অংশ।
গত ১২ এপ্রিল জেলা কারাগারের ফেসবুক পোস্টে জেলার সোহেল ঘটনাটি নিয়ে যা লিখেছেন- ' একটি নির্বাক সাক্ষাৎ ' সময়; রাত ১১.৪৪, তারিখ; ১৪-০৩-২০২৬, লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগার। নিয়মিত রাত্রীকালীন কারাগার পর্যবেক্ষণ শেষে অফিস থেকে বের হচ্ছিলাম। আরপি গেটের বাহিরে দৃষ্টি পড়তেই জিজ্ঞেস করলাম ,বাহিরে অ্যাম্বুলেন্স কেন? দায়িত্বরত আরপি জানালেন একটি নবজাতক দেখা করতে এসেছে তার পিতার সাথে। বয়স ৫ দিন। ডেকে জানতে চাইলাম, বলল জন্মের পর বাবাকে দেখেনি। অতি সংক্ষিপ্ত এই জীবনে বাবার সাথে সাক্ষাত করতে চায়। জেল সুপার স্যারকে জানালাম। স্যার দ্রুত আসলেন। ডিআইজি প্রিজন্স, চট্টগ্রাম স্যারকে জানালেন। স্যার সদয় অনুমোদন দিলেন। কারাভ্যন্তরে প্রবেশ করে খোঁজাখুঁজি করে বাবাকে জানানো হলো একমাত্র ছেলে এসেছে সাক্ষাতে। ছেলেকেও নিয়ে আসলাম।
অবশেষে বাবা-ছেলের মিলনের সেই ক্ষণ এসে উপস্থিত হলো। সমস্ত আইনের উর্ধ্বে উঠে হওয়া এই সাক্ষাত হলো বটে, কিন্তু এই যাত্রায় কোন কথা হলো না। বাবা শুধু জিজ্ঞেস করলেন -স্যার, কথা বলে না যে? কষ্ট চাপা রেখে বললাম, কথা বলবে তুমি দোয়া কর, একদিন কথা বলবে। একটু আদর, এরপর বিদায়। ছেলের অনন্ত অন্তিম যাত্রা শুরু হলো। বাবাকে কারাভ্যন্তরে নিয়ে যেতে যেতে বললাম, তোমার ছেলে ICU তে ৫ দিন জীবনের সংগ্রাম করে অনন্তের পথে পাড়ি দিয়েছেন। বাবার হৃদয় নিংড়ে অশ্রু হয়ে বের হওয়া নির্যাস এবার আর থামানো গেল না। শুধু ভারি কন্ঠে বললাম, জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া জীবনের জন্য দোয়া করো, একদিন আবার হয়তো দেখা হবে। একটা জীবন এই অর্ধেক হৃদয় নিয়ে কাটিয়ে দাও, বাকি অর্ধেক পাবে পরের জীবনে। জীবন বহমান, জীবন বয়ে যায়'।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আনিসুর রহমান জাভেদ
ঠিকানা: নয়াপল্টন, ঢাকা
স্বত্ব © নিউস এক্সপ্রেস মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন