এ সম্পর্কিত আরও খবর
কর্মসংস্থানের সংকটে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন অনেক কৃষক
- ডেস্ক রিপোর্ট
- প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ১১:০১ এএম
-
ছবি: বণিক বার্তা
চারপাশে কাঁচা ধানের গন্ধ নেই, নেই সোনালি ফসলের আনন্দ। বরং খলায় ছড়িয়ে থাকা কালচে, অঙ্কুর গজানো ধান আর দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়া কৃষক পরিবারের নীরব দীর্ঘশ্বাস এ দৃশ্যই এখন বাস্তবতা।
শেকল মিয়া, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর ইউনিয়নের একজন ক্ষুদ্র কৃষক। জীবনের সব সঞ্চয় আর আশা নিয়ে তিনি ডিঙ্গাপোতা হাওরে ২০ কাঠা (স্থানীয়রা ১০ শতাংশে এক কাঠা হিসাব করেন) জমি টঙ্ক নিয়ে এবার ধান চাষ করেছিলেন। প্রতি কাঠা অগ্রিম ২ হাজার ৪০০ টাকা হিসাবে শুধু জমির পেছনেই খরচ হয়েছে ৪৮ হাজার। চাষাবাদ, সার, কীটনাশকসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে আরো প্রায় ১৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে প্রায় ৬৩ হাজার টাকার বিনিয়োগ, যার সিংহভাগই জুগিয়েছেন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে।
তার হিসাব ছিল স্পষ্ট-এ জমি থেকে অন্তত ১৩০ মণ ধান পাবেন। তা বিক্রি করে লাখ টাকার বেশি আয় হবে। ঋণ শোধ করবেন, সংসার চলবে, সেই সঙ্গে মিটবে বড় ছেলের পড়াশোনার খরচও। কিন্তু প্রকৃতির হিসাব আলাদা। ধান যখন ঠিক সোনালি রঙ ধারণ করেছে, তখনই হঠাৎ বন্যার পানি হাওরে ঢুকে পড়ে। চোখের সামনে ডুবে যেতে থাকে ফসল। প্রাণপণ চেষ্টা করে গলাপানিতে নেমে শ্রমিক দিয়ে তিনি ৫০-৫৫ মণ ধান কাটতে সক্ষম হন। কিন্তু সেখানেও শেষ রক্ষা হয়নি। রোদ না পাওয়া, শুকানোর জায়গার অভাব-সব মিলিয়ে ধানগুলোয় অঙ্কুর গজায়, পচে কালো হয়ে যায়। এখন সে ধান আর বাজারে বিক্রির উপযোগী নয়।
একজন ব্যবসায়ী মণপ্রতি ৩০০ টাকা দাম প্রস্তাব করেছিলেন। সব মিলিয়ে হয়তো ১৫ হাজার টাকার মতো পাওয়া যাবে। অথচ ধান কাটতেই শ্রমিক খরচ হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা। লাভ তো দূরের কথা, লোকসানই দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ।
খলায় বসে ধান শুকাতে শুকাতে গত সোমবার শেকল মিয়া বলেন, ‘সবকিছু শেষ হয়ে গেল। ভাবছিলাম ধান বিক্রি করে ছেলেকে টাকা দেব, সংসারটা একটু দাঁড় করাব। এখন নিজেরাই কীভাবে চলব বুঝতেছি না।’
শেকল মিয়ার বড় ছেলে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে স্নাতকে পড়াশোনা করছেন। কিছুদিন আগে তিনি বাবাকে জানিয়েছিলেন, আইইএলটিএসের (ইংরেজি ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষা) প্রস্তুতি নিতে চান। কোচিং, বই আর বাকি খরচ মিলিয়ে তার দরকার প্রায় ৪০ হাজার টাকা। শেকল মিয়া তখন আশ্বাস দিয়েছিলেন, ধান বিক্রি হলেই টাকা দেবেন। আজ সে স্বপ্নও ভেঙে গেছে।
পাশেই বসে পচে যাওয়া খড় নাড়ছিলেন শেকল মিয়ার স্ত্রী। হতাশার কথা লুকাতে পারেননি তিনিও, ‘ছেলের অনেক আশা ছিল। এখন তো নিজেদের খাওয়াই কষ্ট হয়ে গেছে। গত ৬ মে এনজিও থেকে কিস্তি নিতে লোক এসেছিল, বুঝিয়ে পাঠাইছি। আবারো তো আসবে, কীভাবে টাকা দেব জানি না।’
ঋণের চাপ, ফসলহানি আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ-সব মিলিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন শেকল মিয়া দম্পতি। এলাকায় অন্য কোনো কাজেরও সুযোগ নেই। তাই গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়ে পোশাক কারখানায় কাজ নেয়ার কথা ভাবছেন তারা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেকল মিয়া বলেন, ‘এখানে আর কিছু করার নাই। ঋণ শোধ করতে হবে, পরিবারকে বাঁচাতে হবে। তাই ভাবছি চলে যাই।’
হাওরের এ গল্প শুধু শেকল মিয়ার নয়, এটি হাজারো কৃষকের অদৃশ্য কান্নার প্রতিচ্ছবি। যেখানে একটি বন্যা শুধু ফসলই ডুবায় না, ডুবিয়ে দেয় স্বপ্ন, শিক্ষা, আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার হাওরাঞ্চলের কৃষক আজিম হোসেনের কণ্ঠেও হতাশা আর অনিশ্চয়তার সুর। এবারের বন্যা তার জীবনের সব হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। ৬০-৭০ হাজার টাকা ঋণ হয়ে গেছে। সংসারে স্ত্রী আর দুইটা মেয়ে, এদের নিয়ে কীভাবে চলব বুঝতেছি না। এলাকায় তো কোনো কাজ নাই। ভাবতেছি ঢাকায় চলে যাব। গিয়ে রিকশা বা অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে চালাব।’
শেকল মিয়া ও আজিম হোসেনের মতো অনেকেই এখন গ্রাম ছাড়ার কথা ভাবছেন। হাওরের কৃষিজীবী মানুষদের কাছে এ স্থানান্তর যেন শেষ আশ্রয়, জীবন বাঁচানোর তাগিদে শহরমুখী হওয়া। তবে সবার জন্য এ পথও খোলা নেই। মোহনগঞ্জ উপজেলার ৭৬ বছর বয়সী চিত্তরঞ্জন বণিকের চোখে সে অচলাবস্থার নির্মম বাস্তবতা ফুটে ওঠে। জীবনের এ প্রান্তে এসে তিনিও হারিয়েছেন তার একমাত্র ফসল। ডিঙ্গাপোতা হাওরে ১০ কাঠা জমিতে ধান লাগিয়েছিলেন, কিন্তু বন্যার কারণে এক মুঠো ফসলও ঘরে তুলতে পারেননি।
চিত্তরঞ্জন বলেন, ‘বয়স তো ৭৬ হয়ে গেছে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি, ছেলে গার্মেন্টসে কাজ করে, সেখানে সে নিজের পরিবার নিয়ে থাকে। আমরা বুড়োবুড়ি আলাদা থাকি। এখন শুনতেছি অনেকেই ঢাকায় যাবে, গার্মেন্টসে কাজ নেবে। কিন্তু আমাকে এ বয়সে কে কাজ দেবে? আমরা কী করব?’
সূত্র: বণিক বার্তা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আনিসুর রহমান জাভেদ
ঠিকানা: নয়াপল্টন, ঢাকা
স্বত্ব © নিউস এক্সপ্রেস মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন