এ সম্পর্কিত আরও খবর
‘ওরা আমাদের ইচ্ছাশক্তি ভেঙে দিতে চায়’: ইসরায়েলি কারাগারে ধর্ষণের শিকার গাজা ফ্লোটিলার জার্মান অধিকারকর্মী
- নিউজ এক্সপ্রেস ডেস্ক
- প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৬, ১০:২৩ এএম
-
ছবি: সংগৃহীত
‘ওরা আমাদের ইচ্ছাশক্তি ভেঙে দিতে চায়’: ইসরায়েলি কারাগারে ধর্ষণের শিকার গাজা ফ্লোটিলার জার্মান অধিকারকর্মী
লিডকের ভাষ্য, ‘প্রথমে দুজন, পরে তিনজন নারী সেনাসদস্য আমাকে কাপড় খুলতে বলেন। এরপর তারা আমাকে স্পর্শ করতে শুরু করেন।’
সাক্ষাৎকার এবং ইসরায়েলে দায়ের করা একটি ফৌজদারি অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ইসরায়েলি হেফাজতে তৃতীয়বারের মতো বেআইনিভাবে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে তল্লাশি চালানোর সময়, নারী কারারক্ষীরা গাজা ফ্লোটিলার জার্মান অধিকারকর্মী আন্না লিডকেকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করে, তার চিৎকার থামাতে মুখ চেপে ধরে এবং তাকে ধর্ষণ করে।
লিডকে জানান, হামলার সময় তিনি পুরুষ কারারক্ষীদের হাসির শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। তার বিশ্বাস, তারা ঘটনাটি দেখছিলেন এবং সম্ভবত ভিডিওও ধারণ করেছিলেন। ঘটনাটি কারাগারের একটি অংশে ঘটেছিল, যা করিডর থেকে আংশিক টানা একটি পর্দা দিয়ে আলাদা করা ছিল। তবে হামলাকারীরা সেই পর্দাটি পুরোপুরি টানেননি।
২৫ বছর বয়সী লিডকে গত শরতে ইউরোপ থেকে গাজায় মানবিক সহায়তা নিয়ে যাওয়া একটি ফ্লোটিলা বা নৌবহরের সঙ্গে যাত্রা করেছিলেন। গত ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি বাহিনী তাদের নৌযান আটক করে এবং তাকে ইসরায়েলে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে পাঁচদিন আটকে রাখা হয়।
লিডকে বলেন, ইসরায়েলি কারাগারে নৌবহরের সদস্যদের বিরুদ্ধে চালানো নির্যাতন ও সহিংসতা, ধর্ষণ, মূলত তাদের ভয় দেখানো এবং মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।
তিনি গার্ডিয়ানকে বলেন, 'এটা স্পষ্ট যে তারা আমাদের মানসিক শক্তি ভেঙে দিতে এবং আমাদের মুখ বন্ধ করে দিতে চায়। তারা এই অভিজ্ঞতাকে এতটাই ভয়াবহ করে তুলতে চায়, যেন আমরা আর কখনও ফিলিস্তিন নিয়ে কথা না বলি।'

গাজা ফ্লোটিলাটিকে আটক করে ইসরায়েলি নৌযান। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
কিন্তু তিনি তা না করে কয়েক দিনের মধ্যেই বন্ধু এবং চিকিৎসকদের কাছে ঘটনাটি খুলে বলেন।
ডিসেম্বরে তিনি প্রথম নৌবহর-সংশ্লিষ্ট কর্মী হিসেবে প্রকাশ্যে জানান যে, ইসরায়েলের আটককেন্দ্রে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এ ছাড়া আরও এক ডজনের বেশি ব্যক্তি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন। তিনি অবশ্য তাদের অধিকাংশেরই নাম প্রকাশ করেননি।
এখন ইসরায়েলে লিডকের পক্ষে দায়িত্ব পালনকারী আইনজীবীরা তার অভিযোগের তদন্ত দাবি করে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। ইসরায়েলের আইনে, সম্মতি ছাড়া যেকোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশকে ধর্ষণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
লিডকে বলেন, 'আমার লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা যখনই নীরব থাকি, তখনই তারা আরেকজন মানুষের সঙ্গেও একই কাজ করার সুযোগ পায়।'
ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল, ইসরায়েল কারা কর্তৃপক্ষের আইন উপদেষ্টা, কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তকারী বিভাগ (ইয়াহাস) এবং গিভন কারাগারের কমান্ডারের কাছে পাঠানো অভিযোগপত্রটি ইসরায়েলে বন্দিদের ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান 'দায়মুক্তির সংস্কৃতির' বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেন লিডকের আইনজীবী মুনা হাদ্দাদ।
ইসরায়েলভিত্তিক ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংস্থা আদালাহর আইনজীবী হাদ্দাদ বলেন, 'আনার ইচ্ছা হলো ন্যায়বিচার চাওয়া এবং এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে সম্ভাব্য সব আইনি পথ অনুসরণ করা। একই সঙ্গে আমরা সচেতনতা তৈরি করতে চাই এবং দেখতে চাই, তদন্ত শুরুর আমাদের দাবির মুখে ইসরায়েলি ব্যবস্থা কীভাবে সাড়া দেয়।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রায় তিন বছর ধরে ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণ বারবার সংঘটিত হয়ে আসছে। এখন আমরা এমন এক পরিস্থিতি দেখছি, যেখানে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানানো বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধেও ইসরায়েল একই ধরনের আচরণ করতে প্রস্তুত।'
লজ্জাবোধে নীরব না থেকে লিডকে এই হামলার ঘটনাকে তার আন্দোলনেরই একটি অংশে পরিণত করেছেন। যারা এখনও ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি আছেন অথবা ভবিষ্যতে একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, তিনি এখন তাদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।
তিনি বলেন, 'আমি মনে করি না যে, এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বললে আটককেন্দ্রে ধর্ষণের ঘটনা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু একজন রাজনৈতিকভাবে সচেতন নারী হিসেবে আমি মনে করি, এ নিয়ে কথা বলা এবং এর মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে লড়াই করা আমার দায়িত্ব।'
তিনি আরও বলেন, 'এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং এটি অনেক বেশি পদ্ধতিগত একটি বিষয়। আর আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, ফিলিস্তিনি বন্দিরা যা সহ্য করেন, তার তুলনায় আমার অভিজ্ঞতা অনেক, অনেক কম।'
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল তাদের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। একই সময়ে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাকে দেশটির কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন এবং সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা চালানোর প্রচেষ্টারও নিন্দা করেছেন।
জাতিসংঘ চলতি বছরের মে-তে সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতার ঘটনায় অভিযুক্ত পক্ষগুলোর কালো তালিকায় ইসরায়েলের নাম অন্তর্ভুক্ত করে। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নির্যাতনের পাশাপাশি আটক পুরুষদের ধর্ষণের অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়।

ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
এ মাসে ব্রিটেনও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলের আটককেন্দ্রগুলোতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মে-তে নৌবহরের সদস্যদের করা ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের আটককেন্দ্রে নিজেদের নাগরিকদের ওপর কথিত নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের অভিযোগে ফ্রান্সের প্রসিকিউটররাও যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করেছেন।
৩০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ ইতালি থেকে প্রায় ১০০ জন অন্যান্য অধিকারকর্মীদের সাথে একটি বড় আকারের সাবেক নৌযানে যাত্রা করার আগে লিডকে পূর্ববর্তী সাহায্যকারী জাহাজের সদস্যদের কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়েছিলেন। তিনি ইসরায়েলি হেফাজতে যৌন নিপীড়নসহ সহিংসতার সম্ভাবনার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছিলেন যে তা করা প্রায় অসম্ভব।
তিনি বলেন, 'আপনি আগেই জানতে পারবেন যে তারা আপনার ওপর যৌন নিপীড়ন চালাবে, এবং নিজেকে সেভাবে প্রস্তুতও করবেন। কিন্তু ঘটনাটি যখন বাস্তবে ঘটে, তখন মনে হয় যেন আপনি এ বিষয়ে আগে থেকে জানতেন না। কারণ আপনি জানেন না, যে সেসময় আপনার শরীর কেমন প্রতিক্রিয়া জানাবে।'
এখন অন্য কর্মীদের প্রতি তার পরামর্শ শুধু ব্যবহারিক নয়, রাজনৈতিকও।
তিনি বলেন, 'আপনাকে এই বিশ্বাসে অটল থাকতে হবে যে, আপনি যে অভিযানে যাচ্ছেন, সেটি সঠিক। আর শেষ পর্যন্ত বুঝতে হবে, কোনো কিছুই আপনাকে এর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করতে পারবে না।'
৮ অক্টোবর ভোর সাড়ে চারটার দিকে জাহাজের অধিনায়কের ঘোষণায় তার ঘুম ভাঙে। অধিনায়ক ঘোষণা দেন, 'এটি মহড়া নয়, ইসরায়েলিরা আসছে।' ইসরায়েলি বাহিনী জাহাজে উঠে কর্মীদের ক্যানটিনে নিয়ে যায় এবং জাহাজটিকে ইসরায়েলের আশদোদ বন্দরের দিকে নিয়ে যায়। সন্ধ্যায় জাহাজটি আশদোদ বন্দরে পৌঁছায়।
লিডকে জানান, এরপর তাকে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সাবলীল জার্মান ভাষায় কথা বলতে পারা একজন ব্যক্তি তাকে 'নাৎসি যৌনকর্মী বা পতিতা' বলে অপমান করেন।
তার ভাষ্য, এর কিছুক্ষণ পরই যখন তাকে নগ্ন করে তল্লাশি করা হচ্ছিল, তখনই তার সঙ্গে প্রথম যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। লিডকের আইনজীবী বলেন, ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, কোনো আটক ব্যক্তিকে নগ্ন করে তল্লাশি চালানোর আগে তার সম্মতি নিতে হয়। যদি তিনি সম্মতি না দেন, তাহলে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে এসে তার আপত্তি শুনতে হবে এবং পরবর্তী তল্লাশির জন্য লিখিত অনুমোদন দিতে হবে।
আইন অনুযায়ী, নগ্ন তল্লাশি শুধু পোশাকবিহীন দেহের দৃশ্যগত পর্যবেক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং তা অবশ্যই একটি বন্ধ কক্ষে, শুধু নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন করতে হবে। লিডকে বলেন, তিনি নগ্ন তল্লাশিতে সম্মতি দেননি। তারপরও তাকে এমন একটি স্থানে কাপড় খুলতে বাধ্য করা হয়, যা শুধু আংশিকভাবে একটি পর্দা দিয়ে আড়াল করা ছিল। ফলে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পুরুষ সেনাসদস্যরা তার নগ্ন দেহ দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, 'তাদের কয়েকজন হাঁটার সময় সরাসরি আমাদের দিকে তাকিয়েছিল।'
দ্রুত বহিষ্কারের কাগজপত্রে তিনি স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ তার মতে, তাতে কার্যত স্বীকার করে নেওয়া হতো যে তিনি অবৈধভাবে ইসরায়েলে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে তাকে জোরপূর্বক ইসরায়েলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই রাতেই তার চোখ বেঁধে এবং হাতকড়া পরিয়ে তাকে কেতজিওত কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার সম্মতি ছাড়াই আবারও তাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে তল্লাশি করা হয়।
তিনি বলেন, 'আমি তাদের বলেছিলাম, আমি এটা চাই না। কয়েক ঘণ্টা আগেই তারা আমাকে তল্লাশি করেছে, তাহলে আবার কেন তল্লাশি করতে হবে?' তার ভাষ্য, যারা তল্লাশিতে সম্মতি দিয়েছিলেন, তাদের অন্তর্বাস খুলতে হয়নি।
এরপর তাকে কারাবন্দিদের পোশাক দেওয়া হয় এবং একটি নোংরা কক্ষে রাখা হয়, যেখানে বিশুদ্ধ পানীয় জলের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সারা রাত উচ্চ শব্দে গান বাজানো এবং বারবার কারাকক্ষ তল্লাশি চালানোর কারণে তাকে ঘুমাতে দেওয়া হয়নি। এসব তল্লাশির সময় অনুসন্ধানী কুকুরও ব্যবহার করা হয়েছিল। তিনি জানান, একই সময়ে কারাগারের অন্য অংশ থেকে মানুষের চিৎকারও তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন।
১০ অক্টোবর লিডকেকে আবারও স্থানান্তর করা হয়, এবার গিভন কারাগারে। সেখানে তাকে এমন একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, যা একটি পর্দা দিয়ে আংশিকভাবে আড়াল করা ছিল। এরপর তাকে কাপড় খুলতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি অস্বীকৃতি জানালে কারারক্ষীরা জোর করে তার পোশাক খুলে ফেলেন, তার শরীরে আপত্তিকরভাবে হাত দেন এবং তাকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেন।
লিডকের ভাষ্য, নারী কারারক্ষীদের একজন তার যোনিতে আঙুল প্রবেশ করান এবং এরপর তার পায়ুপথেও আঙুল প্রবেশ করান। তিনি বলেন, 'প্রথমে দুজন, পরে তিনজন নারী সেনাসদস্য আমাকে কাপড় খুলতে বলেন। এরপর তারা আমাকে স্পর্শ করতে শুরু করেন। আমি "না" বলেছিলাম। আমি তাদের বলেছিলাম, আমি চাই না তারা আমাকে স্পর্শ করুক এবং তারা আমাকে ব্যথা দিচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'এরপর তারা আমার দুই হাত চেপে ধরেন, যাতে আমি নড়াচড়া করতে না পারি। তারপর তারা আমাকে জোর করে নিচের দিকে ঠেলে দেন। আমি তখনও চিৎকার করার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু তারা আমার মুখ চেপে ধরেন, যাতে আমি চিৎকার করতে না পারি।'
শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি অপমানও ছিল এই ঘটনার একটি অংশ।

গাজায় সহায়তা পৌঁছাতে আসা ফ্লোটিলা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
তিনি বলেন, 'আমি পুরুষ সেনাসদস্যদের হাসতে শুনতে পেয়েছিলাম। তারা সেখানে দাঁড়িয়ে শুধু হাসছিল। আমি জানি, তারা পুরো ঘটনাই দেখতে পাচ্ছিল, কারণ পর্দাটি পুরোপুরি টানা ছিল না।'
লিডকের ধারণা, ঘটনাটি ভিডিও ধারণও করা হয়ে থাকতে পারে। কারণ কারাগারগুলোতে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা ক্যামেরা এবং দেহে ধারণযোগ্য ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়।
এর আগে আটক ফিলিস্তিনি ও কর্মীদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়নের ভিডিও এবং ছবি ইসরায়েলে ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ১২ অক্টোবর ওই কর্মীদের জর্ডানে ফেরত পাঠানো হয়।
লিডকে বলেন, পুরো সময়জুড়েই তিনি অনশন করেছিলেন। তবে তখন খাবারের চেয়ে একটি সিগারেটের প্রতিই তার বেশি তৃষ্ণা ছিল।
আম্মানের একটি হোটেলে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক ও মনোবিদেরা তাদের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানেই তিনি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বিষয়টি জানানোর পথে পদক্ষেপ নেন। তিনি তার এক বন্ধু ও সহকর্মী সাংবাদিককে বলেন, 'তোমার প্রতিবেদনে অবশ্যই উল্লেখ করবে, অন্তত একজন নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।'
জার্মানিতে ফিরে ডিসেম্বরে রাজনৈতিক বন্দিদের নিয়ে আয়োজিত একটি সম্মেলনে নিজের ওপর সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ্যে বলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তিনি বলেন, ঘটনাটি প্রকাশ্যে বলার পর ভয় বা আতঙ্ক নয়, বরং অপ্রত্যাশিত এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করেছিলেন। তার ভাষায়, 'মনে হচ্ছিল, যেন বুকের ভেতরের একটি শক্ত গিঁট ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে।'
তার নৌযাত্রার অন্য নারীরা পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, তাদেরও 'একই ধরনের অভিজ্ঞতা' হয়েছে। অপরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে আক্রমণাত্মক মন্তব্য এলেও সমর্থনের বার্তাই ছিল বেশি।
তিনি বলেন, 'আমি কটু মন্তব্যের আশঙ্কা করছিলাম, বিশেষ করে যেহেতু অভিযুক্তরা নারী কারারক্ষী ছিলেন। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, মানুষ প্রশ্ন তুলবে—এটিকে সত্যিই ধর্ষণ বলা যায় কি না।'
তিনি আরও বলেন, 'ইন্টারনেটে কিছু মানুষ আমার অভিজ্ঞতা নিয়ে তর্ক করেছেন, তারা নিজেদের মতো করে এটিকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেসব আমাকে খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারেনি।'
তিনি বলেন, ওই হামলার মানসিক অভিঘাত এখনও তাকে বহন করতে হচ্ছে। তার ভাষায়, 'এই মুহূর্তে আমি ভালো আছি। এমন কিছু দিন আসে, যখন আমার কিছুই মনে পড়ে না। আবার এমনও দিন আসে, যখন মনে হয় আমি আর কখনও ভালো হতে পারব না। তবে আমার মনে হয়, এটাই স্বাভাবিক।'
তবে গাজামুখী নৌবহরে যোগ দেওয়ার পেছনে যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল, সেখান থেকেই তিনি শক্তি খুঁজে পান।
আর গাজার উপকূলে জনশূন্য অবস্থায় ভেসে আসা নৌবহরের একটি নৌযানকে ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনাও তাকে নতুন অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
তিনি বলেন, 'এটি সার্থক ছিল। আমি যা কিছু সহ্য করেছি, সবই সার্থক ছিল—যদি এর মাধ্যমে অন্তত সামান্য হলেও মানুষের মধ্যে এই আশা জাগানো যায় যে, পরবর্তী নৌবহর আবারও আসবে।'
লিডকের নৌবহর আটককারী বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ 'প্রত্যাখ্যান করছে' ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ইসরায়েল কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
ইসরায়েল কারা কর্তৃপক্ষের এক মুখপাত্র বলেন, 'আপনার অনুসন্ধানে বর্ণিত অভিযোগগুলো আমরা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমাদের কর্মীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন বা পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন চালানোর যেকোনো অভিযোগ ইসরায়েল কারা কর্তৃপক্ষ প্রত্যাখ্যান করছে।'
সম্পাদক ও প্রকাশক: ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
ঠিকানা: ১৩/পি, বীর উত্তম সি.আর.দত্ত রোড, নাসির পয়েন্ট, ২য় তলা, বাংলামটর, ঢাকা-১০০০
স্বত্ব © নিউস এক্সপ্রেস মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন