এ সম্পর্কিত আরও খবর
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযানে বিধ্বস্ত যেসব দেশ
- অনলাইন ডেস্ক
- প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম
-
ছবি: সংগৃহীত
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারের মূল প্রতিশ্রুতিই ছিল বিশ্বব্যাপী উত্তেজনা নির্মূল করা। এ ছাড়া ব্যয়বহুল এবং ধ্বংসাত্মক বিদেশি যুদ্ধে মার্কিন সম্পৃক্ততা বন্ধ করাও ছিল তার অন্যতম প্রতিশ্রুতি। তবে তার ছিটেফোঁটাও বিশ্ব দেখল না, বরং ট্রাম্পের নেতৃত্বে একের পর এক মার্কিন হামলা আরও জোরদার হতে দেখা গেছে। ক্ষমতায় আসার মাত্র এক বছরেরও বেশি সময় পরে ইরানি সরকার উৎখাতে উঠেপড়ে লেগেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল।
গতকাল শনিবার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরানে যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। এ পর্যন্ত যত দেশে ট্রাম্পের আগ্রাসন হয়েছে তন্মধ্যে এই হামলাকে সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে।
বিদেশে ট্রাম্পের সামরিক অভিযান সম্পর্কে মার্কিন জনগণের মধ্যে ব্যাপক হারে সংশয় দেখা গেছে। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন ইরান ও ভেনেজুয়েলা সরকারের ওপর বেপরোয়া আক্রমণ চালিয়েছে। একইসঙ্গে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে মার্কিন হামলা আরও বাড়িয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই এক বছরের শাসনকালে ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে কোন কোন দেশে হামলা চালিয়েছে তা নিচে আলোচনা করা হলো-
ইরান
গতকাল শনিবার সকাল থেকে ইরানে যৌথ হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। হামলায় এখন পর্যন্ত ২০১ জন নিহতের খবর জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট। এই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিশৃঙ্খলা ও ব্যাপক ধ্বংস ডেকে আনতে পারে এমন একটি বিস্তৃত যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে শুরু হওয়া এ হামলাকে গত বছরের জুনে সংঘটিত হামলার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে। হামলার পরবর্তী এক বিবৃতিতে ট্রাম্প এ হামলাকে ‘বড় যুদ্ধ অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এবারের মতো গত বছরের জুনেও ইরান যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক আলোচনায় ব্যস্ত ছিল তখন দেশটির ফোরদো, নাতানজ এবং ইসফাহানে পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। ওই সময় ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধে ৬০০ জনেরও বেশি ইরানি নিহত হয়েছিল। এ ছাড়া দেশটির পারমাণবিক ক্ষমতা ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়া হয়েছে। পরপর মার্কিন দুই আক্রমণই আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অবৈধ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলা
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ চালায় ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির রাজধানী কারাকাসে বোমা হামলা চালায় এবং দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ক্রোধের শিকার দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অভিজাত ইউনিট ডেল্টা ফোর্স।
ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, এই হামলায় ৮৩ জন নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে ভেনেজুয়েলা এবং কিউবার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার বেসামরিক নাগরিকও ছিলেন।
ল্যাটিন আমেরিকার জাহাজে হামলা
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ল্যাটিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মাদক পাচারের অভিযোগে কমপক্ষে ৪৫টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় অন্তত ১৫১ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াচডগ গ্রুপ এয়ারওয়ার্স।
ট্রাম্প এবং তার মিত্ররা এসব হামলাকে আঞ্চলিক মাদক পাচারের বিরুদ্ধে অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি অপরাধী গোষ্ঠীকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প জানান, মাদক পাচার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর সশস্ত্র আক্রমণের সমতুল্য।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তিগুলো সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মতে, এসব অভিযান অবৈধ বিচারবহির্ভূত হত্যার শামিল। এসব অভিযান অপরাধমূলক কার্যকলাপ এবং সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যে পার্থক্য মুছে ফেলে।
নাইজেরিয়া
আফ্রিকায়ও সামরিক অভিযান জোরদার করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। স্থানীয় সরকারগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ দমনের আড়ালে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে নাইজেরিয়ায় ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়েছে মার্কিন সেনারা। পাশাপাশি নাইজেরিয়ান সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ১০০ জন মার্কিন সামরিক কর্মী মোতায়েন করেছেন। নাইজেরিয়ায় মুসলিম গোষ্ঠী কর্তৃক খ্রিস্টানদের ওপর ‘গণহত্যা’ মোকাবিলায় সরকার পদক্ষেপ না নিলে মার্কিন হামলার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
নাইজেরিয়ার সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত খণ্ডন করা দাবিটি সহিংস গৃহযুদ্ধকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে। এই ভুল উপস্থাপন বছরের পর বছর ধরে দেশটিকে খ্রিস্টানবিরোধী নিপীড়নের ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করে।
ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সরকারের সহযোগিতায় উত্তর-পশ্চিম নাইজেরিয়ায় আইএসআইএল (আইএসআইএস)-এর সহযোগীদের লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ‘শক্তিশালী এবং মারাত্মক’ হামলা চালিয়েছে। তবে যেসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে, সেগুলো আসলে আইএসআইএলের সঙ্গে সম্পর্কিত কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ হামলায় লক্ষ্যবস্তু হওয়া অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম রয়েছে বলে জানা যায়নি।
সোমালিয়া
ট্রাম্প প্রশাসন সোমালিয়ায় মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততা আরও সম্প্রসারিত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে আল-শাবাব এবং আইএসআইএল-এর একটি আঞ্চলিক শাখার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য দেশটির সরকারের সঙ্গে কাজ করে আসছে তারা।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সোমালিয়ায় ব্যাপকভাবে বিমান হামলা জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নিউ আমেরিকা ফাউন্ডেশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র কমপক্ষে ১১১টি হামলা চালিয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা এবং জো বাইডেন প্রশাসনের সময় মোট হামলার সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে এই সংখ্যা।
ইয়েমেন
২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কয়েক ডজন নৌ ও বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় হুথিদের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং কয়েক ডজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
গাজায় গণহত্যা যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য হুতিরা লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়েছিল।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জুন মাসে বলেছিল, ২০২৫ সালের এপ্রিলে দেশটির হোদেইদাহের রাস ইসা বন্দরে মার্কিন হামলায় ৮০ জনেরও বেশি বেসামরিক লোক নিহত হয়েছিল এবং এটিকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করা উচিত।
পরে ওমানের মধ্যস্থতায় মে মাসে একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল।
সিরিয়া
পালিমরা শহরে দুই মার্কিন সেনা এবং একজন অনুবাদক নিহত হওয়ার পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় আইএসআইএল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প বলেন, আমেরিকা এই হামলার জন্য দায়ীদের ওপর ‘খুব গুরুতর প্রতিশোধ নিচ্ছে’। সিরিয়ার সরকার জানায়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পরিষেবার একজন কর্মচারী দ্বারা এই হামলা পরিচালিত হয়েছিল। ওই কর্মচারীর কট্টরপন্থি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পরে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
ইরাক
২০২৫ সালের মার্চ মাসে ইরাকের আল-আনবার প্রদেশে এক বিমান হামলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইএসআইএলের একজন উচ্চপদস্থ কমান্ডারকে হত্যা করে।
হামলায় গ্রুপটির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড, আবদুল্লাহ ‘আবু খাদিজা’ মাল্লি মুসলিহ আল-রিফাই এবং অপর একজন অজ্ঞাতনামা কর্মী নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ওই সময় ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্র্যুথ সোশ্যালে এক পোস্টে বলেছিলেন, ইরাকের সরকার এবং কুর্দি আঞ্চলিক সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে আইএসআইএস-এর আরেক সদস্যের সঙ্গে তার দুর্বিষহ জীবন শেষ করা হয়েছিল। পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, শক্তির মাধ্যমে শান্তি!
সূত্র: আলজাজিরা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আনিসুর রহমান জাভেদ
ঠিকানা: নয়াপল্টন, ঢাকা
স্বত্ব © নিউস এক্সপ্রেস মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন