এ সম্পর্কিত আরও খবর
বন্দর নিয়ে চুক্তিতে লুকোচুরির কারণ কী
- ডেস্ক রিপোর্ট
- প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ১০:৫০ পিএম
-
ছবি: সংগৃহীত
বন্দর নিয়ে সরকারের কয়েকটি যুক্তি রয়েছে। তার মধ্যে প্রধান যুক্তি– বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়া যাবে এবং বিদেশি কোম্পানি এলে দুর্নীতি হবে না। তারপর সক্ষমতা বাড়বে। সরকার এসব যুক্তি সামনে রেখে যেসব কাজ করছে, তার মধ্যে অসংগতি খুব প্রকট। যেমন গতকাল একটা অস্বাভাবিক দিনে তারা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। একটা ডেনমার্ক, আরেকটি সুইজারল্যান্ড। এগুলোর পেছনে অন্যান্য যুক্তি হলো, এ চুক্তি জাতীয় স্বার্থ ও সক্ষমতা বাড়াবে। এটা বাংলাদেশের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের বড় একটি অবদান।
এ চুক্তি করার ক্ষেত্রে কয়েকটি আশঙ্কাজনক প্রবণতা দেখা গেছে। সরকার সাংঘাতিক রকমের তাড়াহুড়া করেছে। যে দিনটি স্বাক্ষরের জন্য বাছাই করা হয়েছে, সেটিও স্বাভাবিক ছিল না। তারা বলেছে, যে চুক্তি হয়েছে, সেটিও জনসমক্ষে প্রকাশ করা যাবে না। কাজের ধরনসহ সবকিছুতে একটা লুকোচুরি খেলা!
বিদেশি বিনিয়োগ একটা দেশের জন্য দরকার। কিন্তু সেই বিনিয়োগ দেশের জন্য ভালো, নাকি ক্ষতিকর হবে– তা নির্ভর করে কী ধরনের শর্তে কীভাবে বিনোয়োগটি আসছে তার ওপর। যেসব বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগ করছে, তাদের জবাবদিহি বা স্বচ্ছতার জায়গা আছে কিনা; তারা যেভাবে কাজ করবে কিংবা যেখানে বিনিয়োগ করবে, সেটা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত দিক থেকে বাংলাদেশের স্বার্থে কাজে লাগবে কিনা–এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
এই যে রামপালে বিদেশি বিনিয়োগ, সুন্দরবনে বিদেশি বিনিয়োগ, মাতারবাড়ীতে বিদেশি বিনিয়োগ; সেগুলো ইতোমধ্যে নদীগুলোর সর্বনাশ করেছে, এখনও সর্বনাশ করেই যাচ্ছে। বাঁশখালীতে বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে; পায়রা, রূপপুরে বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে। একটা বিনিয়োগেও বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে– এমন দাবি করা যাবে না। তারপর আদানি চুক্তি, সেটিও এক বিদেশি কোম্পানি।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের কথা বলা হচ্ছে। নৌপরিবহন উপদেষ্টা, বিডার চেয়ারপারসন এটাকে আরও লাভজনক এবং দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিদেশি কোম্পানি নিয়ে আসতে হবে, বলছেন। অথচ কোনো দরপত্র না ডেকে, সরকার নিজেদের সিদ্ধান্ত দিয়ে চুক্তি করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক যে প্রক্রিয়ার মধ্যে যাওয়া উচিত, সে পথে যায়নি।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল আবুধাবির যে কোম্পানিকে দিতে চায়, তার ব্যাপারে তারা যুক্তি দিল– এটা অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। তারা দক্ষতা নাকি সক্ষমতা বাড়াবে; দুর্নীতি থেকে রক্ষা করবে। এ কথা বলে তারা মাসুল করল ৪০ গুণ। মাশুল বৃদ্ধি করা দুর্নীতির আরেকটা ধরন। বিদেশি কোম্পানির জন্য যাতে উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত হয়, সে জন্যই এ মাশুল বৃদ্ধি। অদক্ষতা ও দুর্বল সক্ষমতার কারণ হচ্ছে কাস্টমস ও আমলাতন্ত্র। এই দুটি অপরিবর্তিত রেখে অপারেটর পরিবর্তন করলে দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়বে– এটা মিথ্যাচার ছাড়া কিছু নয়। এসবের পরিণতি কী হবে সেটা বাংলাদেশের অর্থনীতি দেখলে স্পষ্ট হয়। এখানে মাশুল বৃদ্ধির জন্য যে যুক্তি দেওয়া হলো– উন্নয়নের জন্য এটি দরকার, এটাও আরেক মিথ্যাচার। কারণ নিউমুরিং কনটেইনার একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যত খরচ হয়, তার চেয়ে দ্বিগুণ লাভ হয়। সুতরাং তার কাছে উদ্বৃত্ত লাভ রয়েছে। উন্নয়নের জন্য, সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিদেশি বিনিয়োগ কিংবা কোম্পানি লাগবে, মাশুল বৃদ্ধি করতে হবে– এ যুক্তি একেবারেই মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়।
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকার ক্ষমতায় এসেছে একটা গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটানোর জন্য। তার দায়িত্ব হচ্ছে দেশের মানুষ যেন ভয়হীন পরিবেশে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি নতুন গণতান্ত্রিক রূপান্তরে ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচিত সরকার এসে বন্দরের ক্ষেত্রে কী কী কাজ করবে, তার জন্য (যেমন জুলাই সনদ ও সংস্কার কমিশনে যেভাবে বলা আছে) কিছু পথরেখা ঠিক করে দেওয়া। যেমন দুর্নীতির কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু কোথায় কোথায় তা হচ্ছে সেটা সুনির্দিষ্ট করা, সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আর কী কী করতে হবে তা চিহ্নিত করা। সে জন্য জাতীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কীভাবে সক্ষমতা বাড়ানো যায়, সেগুলোর সুপারিশ করাই হলো তাদের কাজ। তারা এর কোনোটাই চিহ্নিত করেনি। পাইকারিভাবে জাতির ওপর একটি বদনাম দিচ্ছে। এটা আন্তর্জাতিভাবে তারা প্রচার করছে। কিন্তু দুর্নীতিটা কোথায় হয়, কীভাবে হয়, তার জন্য কারা দায়ী– এগুলো যদি চিহ্নিত করা না হয়, তাহলে দুর্নীতি দূর করা যাবে না; দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। দুর্নীতিবাজরা কেবল বন্দরে বসে থাকে না, তারা সচিবালয় পর্যন্ত আছে। আর এই যে চুক্তিগুলো করা হলো, এগুলো তো বিদেশি লবিস্ট ও কমিশনভোগীদের সাফল্য ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। বলা যেতে পারে, এটা হলো এই সরকারের আমলে বিদেশি লবিস্ট ও কোম্পানিগুলোর সাফল্যের নজির। এগুলো দেশের স্বার্থের দিক থেকে বিরোধী একটা তৎপরতা। এটা তারা করছে এ জাতীয় হীনম্মন্যতা তৈরি করে যে, বাংলাদেশের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হচ্ছে। সেখানে যদি একটা বন্দরও পরিচালনা করতে না পারে তাহলে এ স্বাধীনতার অর্থ কী? দেড়শর মতো বিশ্ববিদ্যালয় আছে, এগুলো কী কাজ করে, যদি একটা বন্দরও পরিচালনা করা না যায়? মন্ত্রণালয়গুলো দুর্নীতির আখড়া; তাহলে কি মন্ত্রণালয়গুলো বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে দিতে হবে? তাদের যুক্তিগুলোর বিন্যাস এই রকম– তারা দেশের স্বার্থ, জাতীয় সক্ষমতা জলাঞ্জলি দেওয়ার জন্য যে ধরনের কূটতর্ক, কুযুক্তি দেওয়া দরকার, সেটাই করছে। বাংলাদেশের জন্য যেটা দরকার, সেটা হচ্ছে তার আত্মমর্যাদার এবং জাতীয় সক্ষমতার ওপর দাঁড়ানো। জাতীয় সক্ষমতার ওপর দাঁড়ালেই কেবল একটা দেশ যথাযথভাবে গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটাতে পারবে। এই সরকার এখানে যে ভূমিকা রাখতে পারত, সেদিকে না গিয়ে উল্টা পথে হাঁটছে। আর পরবর্তী ৩০ বা ৪০ বছরের জন্য যে চুক্তি হচ্ছে, তার নেতিবাচক পরিণতি দেশের মানুষ ভোগ করবে, অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়বে। তখন জবাবদিহি করার জন্য তাদের কাউকেই পাওয়া যাবে না।
আনু মুহাম্মদ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আনিসুর রহমান জাভেদ
ঠিকানা: নয়াপল্টন, ঢাকা
স্বত্ব © নিউস এক্সপ্রেস মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন