এ সম্পর্কিত আরও খবর
নারী দিবস
উদযাপনের পেছনের গল্প ও ক্লারা জেটকিনের অবদান
- ড. ঊষা রানী বড়ুয়া
- প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১১:০৮ এএম
-
ছবি: নিউজ এক্সপ্রেস
প্রতি বছর ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিনটি কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো উৎসব নয়; এটি নারীর অর্জনকে সম্মান জানানোর, তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসকে স্মরণ করার এবং নারী–পুরুষ সমতার লক্ষ্যে নতুন করে অঙ্গীকার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। পৃথিবীর নানা দেশে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক সংগঠন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আলোচনা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করে। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার, লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক দৃঢ়চেতা নারীর নাম—Clara Zetkin। জার্মানির এই সমাজকর্মী, চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক কর্মী তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন নারীর সমঅধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মর্যাদার সংগ্রামে। তাঁর জীবনগাথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল আনন্দের দিন নয়; এটি ইতিহাসজুড়ে নারীদের অবিরাম সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বিশ্বের বহু দেশে নারীদের জীবন ছিল নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা রাজনৈতিক অধিকার-সব ক্ষেত্রেই তারা ছিল বৈষম্যের শিকার। অনেক দেশে নারীদের ভোটাধিকার পর্যন্ত ছিল না।
এ সময় শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে অসংখ্য নারী কারখানা ও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কাজ করতে শুরু করেন। কিন্তু সেই শ্রমের বিনিময়ে তারা পেতেন কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশ। এই বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে প্রতিবাদের সুর। নারী অধিকারকর্মী ও সমাজসংস্কারকরা সভা-সমাবেশ, আন্দোলন এবং লেখালেখির মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করেন। এই আন্দোলনের অন্যতম সাহসী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেত্রী ছিলেন ক্লারা জেটকিন।
১৮৫৭ সালের ৫ জুলাই জার্মানির স্যাক্সনি অঞ্চলের একটি ছোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষিত ও প্রগতিশীল চিন্তার ধারক। লাইপজিগে পড়াশোনার সময় থেকেই ক্লারা সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রতি আকৃষ্ট হন। খুব অল্প বয়সেই তিনি শ্রমিক অধিকার এবং সামাজিক সমতার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।
সেই সময় জার্মানিতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। এর ফলে ক্লারা জেটকিনকে দেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। জীবনের এই কঠিন সময়েও তিনি থেমে থাকেননি। লেখালেখি, বক্তৃতা এবং সংগঠনের মাধ্যমে তিনি অবিরামভাবে নারীর অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলে গেছেন। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করিয়েছিল যে নারীর মুক্তি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
১৮৯০ সালে জার্মানিতে সমাজতান্ত্রিক বিরোধী আইন বাতিল হওয়ার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং দ্রুতই সমাজতান্ত্রিক নারী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি “ডি গ্লাইখহাইট” (Die Gleichheit) নামে একটি পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেন। এই পত্রিকার অর্থ “সমতা”। এর মাধ্যমে তিনি কর্মজীবী নারীদের জীবনসংগ্রাম, শ্রমের মূল্য এবং সামাজিক বৈষম্যের বিষয়গুলো তুলে ধরতেন। তাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটি দ্রুতই নারী শ্রমিকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ক্লারা নারীদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে এবং সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল-নারীরা কেবল সমাজের নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না; বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
ক্লারা জেটকিনের সবচেয়ে স্মরণীয় অবদান আসে ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে। সেই সম্মেলনে তিনি একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন-বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর একটি দিন নারীদের অধিকার ও সমতার দাবিতে উৎসর্গ করা হোক। ১৭টি দেশের শতাধিক নারী প্রতিনিধি সেই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এবং তারা সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন।
পরের বছর, ১৯১১ সালে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ডে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়। লক্ষাধিক মানুষ সমাবেশ ও মিছিলে অংশ নিয়ে নারীদের ভোটাধিকার, কর্মক্ষেত্রে সমতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার দাবি জানান। ধীরে ধীরে ৮ মার্চ দিনটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করে।
ক্লারা জেটকিন শুধু নারীর অধিকারের জন্যই নয়, বিশ্বশান্তির পক্ষেও ছিলেন এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি প্রকাশ্যে যুদ্ধের সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, যুদ্ধ সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে, অথচ এর সুফল ভোগ করে ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী। যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কারণে তাঁকে নানা রাজনৈতিক চাপ ও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হতে হয়। তবুও তিনি শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
পরবর্তী সময়ে তিনি জার্মান সংসদ রাইখস্ট্যাগের সদস্য হিসেবে কাজ করেন এবং জীবনের শেষভাগ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান সম্পর্কে তিনি বারবার সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন।
এক শতাব্দীরও বেশি আগে ক্লারা জেটকিন যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ তা বিশ্বব্যাপী এক শক্তিশালী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে United Nations আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। আজ এই দিনটি লিঙ্গসমতা, নারীর নেতৃত্ব, শিক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
সমান মজুরি, নারীর নিরাপত্তা, কন্যাশিশুর শিক্ষা এবং নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ-এসব বিষয়কে সামনে রেখে বিশ্বজুড়ে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। ক্লারা জেটকিনের জীবন আমাদের শেখায়-সাহস, আদর্শ এবং দৃঢ় সংকল্প থাকলে একজন মানুষও ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস তাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি একটি প্রতিশ্রুতি-একটি এমন পৃথিবী গড়ার, যেখানে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদা, অধিকার এবং সুযোগ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে।
লেখক: ড. ঊষা রানী বড়ুয়া
লাইব্রেরিয়ান ও জেন্ডার সমন্বয়কারী, সিরডাপ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আনিসুর রহমান জাভেদ
ঠিকানা: নয়াপল্টন, ঢাকা
স্বত্ব © নিউস এক্সপ্রেস মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন