এ সম্পর্কিত আরও খবর
দ্য গার্ডিয়ানকে বিশ্লেষকরা
ট্রাম্প প্রশাসনে হযবরল, ইরানের ফাঁদে দশকজুড়ে ভুগতে পারে যুক্তরাষ্ট্র
- নিউজ এক্সপ্রেস ডেস্ক
- প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম
-
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান যখন ইরানে যুদ্ধে শুরুর জন্য প্রথম হামলা চালায়, তখন ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা এক কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়ে। তেহরানে শাসক পরিবর্তনের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনা খুব দ্রুত মুখ থুবড়ে পড়ে। ফলে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের মুখোমুখি ট্রাম্প প্রশাসন।
ইরানে মেয়েদের স্কুলে মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে ১৭৫ জন নিহত হন। পরে জানা যায়, পেন্টাগন হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে পুরোনো গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করেছিল। অন্যদিকে ইরানের প্রথম দফা ক্ষেপণাস্ত্র পাল্টা হামলার বেশিরভাগই প্রতিহত করা হলেও একটি ড্রোন কুয়েতে মার্কিন কমান্ড সেন্টারে আঘাত হানে। এতে ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন ও আরও কয়েক ডজন আহত হন।
এদিকে যুদ্ধ শুরু হতেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আটকা পড়েন হাজারো মার্কিন নাগরিক। তাদের সরিয়ে নিতে দ্রুত একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে বাধ্য হয় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। তবে একই হামলায় ওয়াশিংটনের পছন্দের সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের অনেকেই নিহত হন। এরপর প্রথম ভাষণে ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে শুধু বলেন, আমরা কাজ শেষ করলে আপনারা নিজেদের সরকার নিজেরাই নিয়ে নিন। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দেশনা দেননি।
পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে প্রায় ১১.৩ বিলিয়ন ডলার। তবে এতে যুদ্ধ প্রস্তুতির ব্যয় কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার খরচ অন্তর্ভুক্ত আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, যদিও চূড়ান্ত পরিণতি এখনও অনিশ্চিত।
ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসন বহু বছর ধরে যুদ্ধ পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন।
তাদের মতে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন উপদেষ্টার সীমিত পরামর্শ, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় ব্যবস্থার ভেঙে পড়া এবং ট্রাম্পের অনিশ্চিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া— এই যুদ্ধকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্য যেকোনো মার্কিন সামরিক অভিযানের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক হোয়াইট হাউস সমন্বয়কারী ফিলিপ গর্ডন বলেন, ‘যথেষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া এমন যুদ্ধ পরিচালনা করা খুবই কঠিন।’
মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা সত্যি বিস্ময়কর যে ট্রাম্প নিজেই এই পরিস্থিতিতে অবাক হচ্ছেন।’
গর্ডনের মতে, আগের প্রশাসনগুলো ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি বহুবার বিশ্লেষণ করেছিল। কিন্তু প্রতিবারই একই সমস্যায় পড়তে হয়েছে যে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, ‘এই কারণেই আমরা ২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তি করেছিলাম এবং শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা করিনি।’
কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় এসে পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন।
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযানে কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। খামেনি ও তার কয়েক ডজন শীর্ষ উপদেষ্টাকে হত্যার পেছনে ইসরায়েল ও মার্কিন যৌথ গোয়েন্দা তথ্য ভূমিকা রেখেছিল।
প্রথম দিকে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এটি হয়তো আগের ১২ দিনের অভিযানের মতোই হবে— যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে নির্ভুল হামলা চালিয়ে দ্রুত যুদ্ধ থেকে সরে আসে। কিন্তু এবার ইরান লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাম্প ও তার প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ একের পর এক ব্রিফিংয়ে ইরানের নেতৃত্ব পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করলেও এই যুদ্ধের জয় বলতে ঠিক কী বোঝাবে, সে বিষয়ে কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই।
একইভাবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ব তেলের সরবরাহ সংকুচিত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে— তা কীভাবে ঠেকানো হবে, সে বিষয়েও পরিষ্কার পরিকল্পনা নেই।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মাইকেল রুবিন বলেন, সামরিক পরিকল্পনা অসাধারণ ছিল। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি এখন বড় ধরনের বিশৃঙ্খলায় পরিণত হচ্ছে।
তার ভাষায়, যে কোনো পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলো একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই হামলা করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো— আমরা লক্ষ্য ঠিক করেছি, কিন্তু পরিষ্কার লক্ষ্য নেই। এর দায় পেন্টাগনের নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
যুদ্ধের লক্ষ্যও বারবার বদলেছে। জানুয়ারিতে নৌবাহিনীর বড় সমাবেশের সময় লক্ষ্য ছিল ইরানের বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দেওয়া। এরপর লক্ষ্য হয় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। পরে আবার লক্ষ্য নির্ধারণ হয় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস করা। এখন আবার নতুন লক্ষ্য দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া।
এই প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি হয়ে গেছে। এমনকি এর প্রভাবে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা মাইকেল সিং বলেন, ‘প্রতিটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য আলাদা সামরিক কৌশল প্রয়োজন ছিল।’
তিনি বলেন, ‘এখন যেহেতু ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, তাই যুদ্ধ কখন শেষ হবে সে সিদ্ধান্তের একটি বড় অংশ ইরানের হাতেই চলে গেছে।‘
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে ছোট একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন।
ক্ষমতায় এসে তিনি তথাকথিত ডিপ স্টেট বা ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির প্রতিষ্ঠিত আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তিনি দাবি করেছিলেন, এসব কর্মকর্তা তার আগের প্রশাসনের নীতি পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছিলেন।
ফলে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে ব্যাপকভাবে ছাঁটাই করেন। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্টেট ডিপার্টমেন্টেও বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই করেন। এর ফলে যুদ্ধ শুরুর সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা প্রস্তুত ছিল না।
অনেক মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও আগে থেকে ছিল না এবং ঝুঁকিপূর্ণ দূতাবাসগুলোও যুদ্ধের শুরু পর্যন্ত খোলা ছিল।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাবেক সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব মারা কার্লিন বলেন, ‘এই যুদ্ধ আমাদের শুরু করা। স্পষ্টতই আমি অপারেশনাল নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা বুঝি, কিন্তু কিছু কিছু জিনিস আগে থেকে প্রস্তুত রাখতে হয়, যাতে কিছু ঘটলে আপনি সাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারেন।’
এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য অঞ্চল থেকেও সামরিক সম্পদ সরাতে হচ্ছে। এশিয়ায় উত্তর কোরিয়া ও চীনের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় স্থাপন করা কিছু বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সরিয়ে আনা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাঘ বলেন, ‘এই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হবে—মার্কিন সামরিক শক্তিকে কার্যত অপচয় করা।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতার ওপর বড় প্রভাব পড়বে। এর প্রভাব সম্ভবত কয়েক দশক ধরে টিকে থাকবে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আনিসুর রহমান জাভেদ
ঠিকানা: নয়াপল্টন, ঢাকা
স্বত্ব © নিউস এক্সপ্রেস মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন